বিশেষ প্রতিবেদন:নানা পুষ্টিগুণ, সহজলভ্যতা ও ধর্মীয় আবেগ জড়িত থাকায় খেজুর নিয়ে মুসলমানদের আগ্রহ বরাবরই বেশি। তাই বছরের বারোমাস তো বটেই রমজানে এর চাহিদা বাড়ে কয়েকগুণ।
কয়েকশ’ কোটি টাকার পণ্য বেচাকেনা হয় কেবল ১ মাসেই। দীর্ঘদিন অনুসন্ধান ও নজরদারিতে জানা গেছে রাজধানীর বাদামতলী ও বন্দরনগরীসহ বড় শহরে আমদানিকারক, কোল্ডস্টোরেজ মালিক, পাইকারি ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতাসহ সরবরাহের প্রায় সব স্তরেই নানারকম প্রতারণা করা হয় ভোক্তার সঙ্গে।
আরও পড়ুন
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ড্রাইভার মালেকের ১৩ বছর কারাদণ্ড
কয়েকবছর আগে মেয়াদ শেষ হলেও বিক্রেতার ভাণ্ডারে মজুদ থাকা পর্যন্ত এগুলো সজীব ও সতেজ রাখতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়। স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও যুগের পর যুগ ধরে বিক্রেতার এমন অমানবিক কাজে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতা। শুধু আর্থিকভাবেই নয়, চাকচিক্যের আড়ালে স্বাস্থ্যগত সমস্যায়ও পড়ছেন অনেকে।
আগে খোলা খেজুর বেশি চললেও কয়েকবছর আগে থেকে শুরু হয় প্যাকেটের প্রচলন। তখন থেকেই চাকচিক্যের আড়ালে মেয়াদহীন, নিম্নমানের পণ্য গছানো সহজ হচ্ছে। সুপারশপ থেকে মহল্লার টুকরির দোকান কিংবা ফেরিওয়ালা-সবার কাছেই এখন দেখা মেলে প্যাকেটের খেজুর।
আরও পড়ুন
সেনাবাহিনী জুলাই আন্দোলনে আহতদের পাশে থাকবে:সেনাবাহিনী প্রধান
বাসায় বা খাওয়ার সময় খুললে ধরা খায় প্রতারণা। উপরে ভাল নিচে মন্দের মিশেল। স্বাদহীন, পোকায় ধরা খেজুরও পান অনেকে।
খোলা বা বস্তার খেজুরকে অনেকে ‘মসজিদের খেজুর’ বলেন। এগুলোর ক্রেতা সাধারণত নিম্নবিত্তরা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর এ খেজুর। মিষ্টি বাড়াতে মেশানো হয় চিনি, স্যাকারিন। কোল্ডস্টোরেজের সবচেয়ে বাজে খাবারটিকে পায়ের চাপে বস্তায় ভরে পাঠানো হয় বাজারে। ‘গরিবের খাবার’ বলায় মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত এবং নিম্নবিত্তরাও মানসম্মান টেকাতে কিনে প্যাকেট খেজুর। এখানে বেশি চলে ১ কেজি ও ২ কেজির প্যাকেট। এসব দোকানে আরও কম পরিমাণও বিক্রি হয়।।
একটু ভাল দেখতে কিন্তু নিম্নমানের ও মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া খেজুরগুলোর জন্য আবার ভিন্ন পদ্ধতির কারসাজি। ভেজা ভাব দূর করা দরকার সবার আগে তাই এগুলো রোদে শুকিয়ে, কেমিক্যাল মিশিয়ে আবার প্যাকেটজাত করে বিক্রি করে বাদামতলীর বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান। আর অগনিত ছোট ব্যবসায়ীরই প্রধান কাজ এটি।
এমনই দুটি প্রতিষ্ঠান জান্নাত এন্টারপ্রাইজ ও জান্নাত ফ্রুটস। এগুলোর মালিকের নাম হাজি শামসুল হক সরকার। দীর্ঘসময় নজরদারি ও অনুসন্ধানে দেখা যায়, মক্কা-মদিনা-জান্নাত এসব নাম ব্যবহার মূলত প্রতারণার জন্য। এমন পবিত্র নাম জুড়ে দিলেও ব্যবসায়ের আড়ালে অপবিত্র কাজ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। রমজানে তা বাড়ে কয়েকগণ। শুধু এ মাসেই বিক্রি হয় দেড়কোটি টাকারও বেশি।
অভিযোগ আছে- বাদামতলীল প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে খেজুর সিন্ডিকেট রয়েছে।
রোদে দিয়ে স্যাঁতস্যাঁতে ভাব দূর করা খেজুর অফিসের পাশের রুমে খোলা অপরিচ্ছন্ন হাতে কর্মীদের দিয়ে চলে প্যাকেটজাত করার কাজ। নাম না জানা খেজুর হয়ে যায় ধাপাস, আজওয়া, মারিয়ামসহ আরও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ নামের অধিকারী। শুধু নামপরিচয় বদলই নয়, এসব পণ্যের দামও বাড়ে কয়েকগুণ।
কোম্পানি মালিকের দাবি, মূলত সুপারশপে যায় ৫ কেজির প্যাকেট। বড়সড় সুপারশপ তার দখলে। প্রায় সবধরনের ফলের সরবরাহকারী তিনি।
হাজি শামসুল হক দাবি করেন, সুপারশপে এসব প্যাকেট করা পণ্য যায় না। সরাসরি আমদানি করা হলে পুনরায় প্যাকেট করা লাগে না। কিন্তু আমরা প্রমাণ পাই, তার কার্যালয়ে ৫ কেজির প্যাকেট তৈরি হয়।
আমদানি পণ্য আবার কেন প্যাকেট করতে হবে- এ প্রশ্নের উত্তর কর্তৃপক্ষের পক্ষে যা বলা হোক, মার্কেট ঘুরে অন্তত এটুকু সহজেই বুঝা যায়–মালিকের পকেট ভারির বাণিজ্যটা এখানে জমজমাট।
কেননা, নাম ও লোগো বসানো কিংবা কোম্পানির প্রচারের চেয়ে এখানে লাভ কয়েক রকম।
প্রথমত, দাম ও মেয়াদ নিয়ে কারসাজি
দ্বিতীয়ত, ভাল খেজুরের সঙ্গে মানহীন পচা ও মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুর মেশানো।
তৃতীয়ত, ইচ্ছেমত নাম ও দাম বসিয়ে মার্কেটে প্রতিযোগিতা তৈরি করে দাম বাড়ানো।
সাধারণ ক্রেতার কাছে তো বটেই কোন সংস্থার অভিযানেও ধরা খায় না এমন বড় কোম্পানির লোকেরা।
অর্থ ও কৌশলে ম্যানেজ করা থাকে সব।
পুনরায় প্যাকেট করতে তারা চকসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে কার্টুন কিনে। আবার এ কাজে নেয়া আছে বিএসটিআইয়ের অনুমতি।
বি-সাইন দিয়ে সবই জায়েজ করে নেয়ায় কোন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাও তাদের ধরতে পারে না।
তার স্বীকারোক্তি- অনেক টাকা খরচ করে বিএসটিআইয়ের অনুমতি এনেছেন। অবশ্য এখানে বেশি টাকা খরচ করলেও তাদের লোকসান নেই।
একবার অনুমতি দেয়ার পর বিএসটিআইয়ের আর দেখার সুযোগ নেই। কেননা লাখলাখ কেজি পণ্য কেবল ব্যবসায়ীর একচ্ছত্র দাপট ও কৌশলে মার্কেটে যায়। বেশি খরচ করে আনা অনুমতিও তাদের একধরনের বিনিয়োগ। বিক্রি করে এর চেয়ে অগনিত গুণ বেশি টাকা উঠে আসে সহজেই।
একসাথে ৫ কেজি কিনলে দাম পাওয়া যায় ৪০০ টাকা কেজি, প্যাকেটবন্দি খেজুর খুচরায় হাজার টাকার বেশি দামে বেচা যায়। লাভের পরিমাণ তখন বাড়ে কয়েকগুণ। এই সুযোগটিই নেয় ব্যবসায়ীরা। যেটিকে অনৈতক ও শাস্তিযোগ্য বলে মনে করে ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ।
সিন্ডিকেটের খবর সবাই জানলেও দর্ঘিদিন ধরে চলে আসায় ক্ষোভ জানান ক্রেতারা। অভিযোগ আছে , সবদিক ম্যানেজ করে চলে লোকঠকানো খেজুরের ব্যবসা।